গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের সতর্কতা এবং করনীয়
গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস বা প্রথম ট্রাইমেস্টার (১ম- ১২তম সপ্তাহ) মা ও অনাগত
শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়েই ভ্রূণের প্রধান
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হয়। তাই সামান্য অবহেলাও গর্ভের শিশুর ওপর প্রভাব
ফেলতে পারে। এ কারণে গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের সর্তকতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরী।
এই পোস্টে গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসে কি কি বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা
উচিত এবং করণীয় দিকগুলো তুলে ধরা হলো।
গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসে গর্ভবতী মায়েদের শরীরে হরমোনগত পরিবর্তনের বেশ
কিছু লক্ষণ দেখা যায়। যেমন বমি ভাব, বমি, মাথা ঘোরা, শরীর
খারাপ লাগা, ক্লান্তি বোধ, স্তনের পরিবর্তন,অনিদ্রা জনিত সমস্যা, ঘন ঘন
প্রসাব হওয়া, বুক জ্বালাপোড়া করা, কষ্টকাঠিন্য ইত্যাদি।
গর্ভাবস্থায় এগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু এই সময় কিছু ঝুঁকিও রয়েছে।
সুতরাং প্রয়োজন বাড়তি সর্তকতা ও সঠিক চিকিৎসা।
পেজ সূচিপত্রঃ গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের সতর্কতা এবং করনীয় দিকগুলো জেনে নিন
-
গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের সর্তকতা (যা থেকে বিরত থাকতে হবে)
-
গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের বিশেষ লক্ষণ
-
গর্ভাবস্থায় করনীয় দিকগুলো
- শেষ কথাঃলেখকের মন্তব্য
গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের সতর্কতা (যা থেকে বিরত থাকতে হবে)
-
ওষুধ সেবনঃ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন ধরনের ব্যথা নাশক বা অন্য কোনো
ওষুধ খাওয়া যাবেনা।
-
ভারী কাজ ও ঝাঁকনিঃ ভারী জিনিস তোলা, পেটে চাপ পড়ে এমন কাজ এবং বেশি
ঝাঁপনি লাগে এমন ভ্রমণ (যেমনঃ মোটরসাইকেল, খারাপ ভাঙ্গা রাস্তা)
এড়িয়ে চলতে হবে।
-
খারাপ অভ্যাসঃ ধূমপান, মদ্যপান, ওয়েলি ফাস্টফুড, টেস্টিং সল্ট
এবং ক্যাফেইন(চা, কফি) অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে
হবে।
-
অনিরাপদ খাবারঃ কাঁচা বা আধা সিদ্ধ মাংস, ডিম, সামুদ্রিক
মাছ(যেগুলোতে পারদ বেশি থাকে) এবং পাস্তরিত নয় এমন দুধ খাওয়া নিষেধ।
- সংক্রমণ ও দুর্ঘটনা থেকে সর্তকতাঃ ভিড় বা সংক্রমণ প্রবণ জায়গা এড়িয়ে চলুন। হাত পরিষ্কার রাখুন এবং পরিছন্নতা বজায় রাখুন। পিচ্ছিল জায়গায় চলাচলের সময় সাবধান থাকুন, কারণ পড়ে গেলে গর্ভে শিশুর ক্ষতি হতে পারে এছাড়া গর্ভপাত হওয়ার মতো ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
- সহবাসের সতর্কতাঃগর্ভাবস্থার শুরুতে সহবাসের বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো বিশেষ করে যদি আগে গর্ভপাতের ইতিহাস থাকে। গর্ভকালীন সময়ে প্রথম তিন মাস এবং শেষের তিন মাস সহবাসে লিপ্ত না হওয়াই উত্তম।
- বিপদে লক্ষণ চিনে রাখাঃনিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যানঃ
- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
- তীব্র তলপেটে ব্যথা
- জ্বর বা তীব্র মাথাব্যথা
- হঠাৎ মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান ভাব
গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের বিশেষ লক্ষণ
গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসে (প্রথম ট্রাইমিস্টার) হরমোনের তীব্র
পরিবর্তনের কারণে শরীরে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ দেখা দেয় এই
সময় প্রধান লক্ষণ গুলোর মধ্যে রয়েছেঃ
-
বমি বা বমি-বমি ভাবঃ সকালের দিকে বেশি হলেও এটি সারাদিনই হতে পারে একে
মর্নিং সিকনেস বলা হয়।
-
চরম ক্লান্তিঃ শরীরে প্রজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে
প্রচন্ড ঘুমঘুম ভাব ও ক্লান্তি লাগে।
-
ঘন ঘন প্রসাবের চাপঃ জরায়ুর আকার বড় হওয়ার কারণে ও রক্তের
প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে ঘনঘন প্রসবের চাপ বাড়ে।
-
স্তনের পরিবর্তনঃ স্তন ভারী, ফোলা বা স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে এছাড়া
হালকা অথবা তীব্র ব্যথা অনুভব হতে পারে।
-
মেজাজের পরিবর্তন(মুড সুইং) ঃ হরমোনের ওঠা নামার কারণে
হঠাৎ রাগ, কান্না বা বিষন্নতা কাজ করতে পারে।
-
হজমের সমস্যা ও অরুচিঃ বুক জ্বালা, গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে
পারে এবং খাবারে অরুচি বা নির্দিষ্ট কোন গন্ধের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা
তৈরি হতে পারে।
এই লক্ষণগুলো গর্ভাবস্থায় একেবারে স্বাভাবিক। তবে তলপেটে তীব্র ব্যথা,
অতিরিক্ত রক্তপাত বা প্রচন্ড মাথা ব্যথা হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ
নিতে হবে।
গর্ভাবস্থায় করনীয় দিকগুলো
নিয়ম মতো ডাক্তারের পরামর্শ ও চেকআপ
গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব একজন অভিজ্ঞ গাইনি ডাক্তারের কাছে যান। প্রথম চেকাপে প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা, ইউরিন টেস্ট ও আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ ও ভিটামিন(যেমন, ফলিক অ্যাসিড) নিয়মিত গ্রহণ করুন। নিজের ইচ্ছায় কোন ওষুধ কখনোই খাবেন না।
আল্ট্রাসনোগ্রাফিঃ গর্ভধারণের প্রথম দিকে আলট্রাসনোগ্রাফি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ।এই পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। যেমন ভ্রুনের সংখ্যা ও বয়স, বাচ্চা প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ, ভ্রুনের স্পন্দন, এক্টোপিক বা মোলার প্রেগনেন্সি ইত্যাদি।
সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ
প্রথম ৩ মাসে মায়ের শরীরে বমি বমি ভাব, অরুচি ও দুর্বলতা বেশি দেখা যায়।
তবুও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।যেমন-
-
শাক সবজি ও ফলমূল
-
ডিম, দুধ, দই ও মাছ
-
ডাল ও সম্পূর্ণ শস্য।
-
আয়রন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার
কাঁচা বা অর্ধ সেদ্ধ খাবার, ফাস্টফুড,স্ট্রিট ফুড ও অতিরিক্ত
তেল মসলা এড়িয়ে চলুন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম
গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের সর্তকতা হিসেবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এ সময় শরীর দুর্বল ও ক্লান্ত লাগে। তাই দিনে কিছু সময় বিশ্রাম নিন এবং রাতে কমপক্ষে ৭-৮ ঘন্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।ভারী কাজ ও অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা কমানো
মানসিক চাপ গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ভয় বা টেনশন থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন। কুরআন তেলাওয়াত শোনা, বই পড়া বা মেডিটেশন মানসিক শান্তি পেতে সাহায্য করে।
বমি বমি ভাব ও অস্বস্তি সামলানো
প্রথম তিন মাসে অনেকেরই সকালে বমি বমি ভাব বা বমি হয় এছাড়া কারো
ক্ষেত্রে পুরো প্রেগনেন্সির সময় জুড়েই বমি ভাব দেখা দিতে পারে বা বমি হতে
পারে। এ সময়-
-
অল্প অল্প করে বারবার খাবার খান
-
খুব মসলাযুক্ত বা তেল চর্বি খাবার এড়িয়ে চলুন
- আদা বা লেবু পানিতে মিশিয়ে খেতে পারেন(ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী)
- বমি বমি ভাব হলে হালকা ঝাল বা টক কিছু খেতে পারেন
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
সদ্য গর্ভবতী মায়ের শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য পরিবারের সবাইকেই পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। এছাড়া
গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের সর্তকতা মেনে চললে মা ও শিশুর সুস্থতা
অনেকটাই নিশ্চিত করা যায়। এই সময়টি যত্ন, ধৈর্য ও সচেতনতার সঙ্গে
কাটানো অত্যন্ত জরুরী। নিয়ম মতো ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চেকআপ,
নিয়ম মতো ওষুধ খাওয়া, সুষম খাবার খাওয়া, বিশ্রাম ও
ঘুম, ইতিবাচক মানসিকতা এই বিষয়গুলোই সুস্থ গর্ভাবস্থার মূল
চাবিকাঠি।
সদ্য গর্ভবতী মায়ের শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য পরিবারের সবাইকেই পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। এছাড়া
গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাসের সর্তকতা মেনে চললে মা ও শিশুর সুস্থতা
অনেকটাই নিশ্চিত করা যায়। এই সময়টি যত্ন, ধৈর্য ও সচেতনতার সঙ্গে
কাটানো অত্যন্ত জরুরী। নিয়ম মতো ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চেকআপ,
নিয়ম মতো ওষুধ খাওয়া, সুষম খাবার খাওয়া, বিশ্রাম ও
ঘুম, ইতিবাচক মানসিকতা এই বিষয়গুলোই সুস্থ গর্ভাবস্থার মূল
চাবিকাঠি।

.webp)
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url