কালচে ধূসর বর্ণের মধ্যে সাদা-কালোর ছোপ সব মিশেলের ছোট্ট একটি বীজ, যা
আপনার স্বাস্থ্যকে আমল বদলে দিতে পারে। বলছিলাম চিয়া সিড (Chia Seed) এর
কথা। দেখতে ছোট হলেও এই বীজটি পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং একে বলা হয়
প্রকৃতির ''সুপারফুড''। আজকের দিনে, স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের খাদ্য তালিকায় এটি
একটি অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। চলুন, চিয়া সিডের জাদুকরী ও উপকারী
গুনাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত জানি।
চিয়া সিড মূলত প্রাক-কলম্বিয়ার যুগে অ্যাজটেকদের দ্বারা চাষ হতো
এবং মেসোয়ামেরিকান সংস্কৃতিগুলির প্রধান খাদ্য ছিল। এছাড়া ইতিহাস
হাতড়ে জানা যায় এই বীজ প্রাচীন মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতায় এটি শক্তি ও
সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এই বীজ মিন্ট বা পুদিনা পরিবারের এক ধরনের ফুলের বীজ। এই
বীজ হাইগ্রোস্কোপিক বা তরল শোষক অর্থাৎ কোন তরলের সাথে মেশানো হলে তা সেই
তরল বা পানীয়কে শোষণ করে থকথকে জেলিভাব প্রদান করে। চিয়া সিড নিজের ওজনের চেয়ে
১২ গুণ বেশি তরল পদার্থ শোষণ করতে পারে। চিয়া সিড খাওয়ার উপকারিতা ও নিয়ম
জানতে বিস্তারিত এই আর্টিকেলটি পড়ে নিন।
পেজ সূচিপত্রঃ- সকালে খালি পেটে চিয়া সিড খাওয়ার উপকারিতা ও নিয়ম
সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন
USDA অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রাম চিয়া সিড থেকে ৪৮৬ ক্যালরি পাওয়া
যায়। এছাড়া সোডিয়াম ১৬ মিগ্রা, পটাশিয়াম ৪০৭ মিগ্রা
, ডায়েটারি ফাইবার বা খাদ্য আস পাওয়ার যায় ৩৪ গ্রাম। একই
সাথে ফসফরাস, কপার,
সেলেনিয়ামের মতন ট্রেস মিনারেলেরও এক চমৎকার উৎস এই বীজ।
এছাড়াও এতে রয়েছে ওমেগা -৩ ফ্যাটি এসিড, এন্টিঅক্সিডেন্ট সহ ভিটামিন
ও মিনারেল। চিয়া সিডের পুষ্টিগুণের ব্যাপারে তো জানা গেল, এবার জেনে
নেওয়া যাক এর স্বাস্থ্য উপকারিতা গুলো সম্পর্কে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে
চিয়া সিডে উপস্থিত ওমেগা -৩ ফ্যাটি এসিড রক্তে কোলেস্টেরল এর মাত্রা কমায়,
হৃদকম্পন স্বাভাবিক রেখে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। একই সাথে রক্ত জমাট বাধা
প্রতিহত করে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে
চিয়া সিডের বিদ্যমান ফাইবার মূলত অদ্রবনীয় খাদ্য আঁশ এবং মিউসিলেজ
প্রকৃতির। এই ফাইবার রক্তের শর্করা মাত্রা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ধীর গতি সম্পন্ন
করে তোলে ফলে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়
The Nurse's Health Study এর গবেষণায় দেখা যায় যারা আলফা
লিনোলেনিক অ্যাসিড ঠিক পরিমাণে গ্রহণ করে তাদের ৪০ শতাংশের মধ্যে
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হ্রাস পায়। এছাড়াও ৬৫ বছর বয়স বা তার ঊর্ধের
৫০০০ হাজার জন পুরুষ ও মহিলার উপর করা অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায় যারা
আলফা লিনোলেনিক এসিড গ্রহণ করে তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশের এস্কিমিক
ডিজিজের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
প্রদাহ হ্রাস করে
চিয়া সিডে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ওমেগা -৩ ফ্যাটি
অ্যাসিড দেহের প্রদাহ হ্রাস করে। যার ফলে ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী অসুখের
বিরুদ্ধেও দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে
চিয়া সিডে ফাইবার থাকায় তা পরিতৃপ্তি দেয়। ফলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে
রাখে যা ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
সকালে চাইলে ওর পুডিং জুসচিয়া সিড খাওয়ার আরো কিছু উপকারিতা রয়েছে যেমনঃ-
চিয়া বীজ হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষ উপকারী।
চিয়া সিড মালয়শয়(Colon) পরিষ্কার রাখে, ফলে কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
চিয়া সিড শরীর থেকে টক্সিন (বিষাক্ত পদার্থ) বের করে দেয়।
চিয়া সিড প্রদাহ জনিত সমস্যা দূর করে।
চিয়া সিড ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে।
চিয়া বীজ ক্যান্সার রোধ করে।
চিয়া সিড হজমে সহায়তা করে।
চিয়া বীজ হাঁটু ও জয়েন্টের ব্যথা দূর করে।
চিয়া সিড ত্বক,চুল ও নখ সুন্দর রাখে।
চিয়া সিড খাওয়ার নিয়ম
এক গ্লাস পানিতে দুই চামচ চিয়া সিড, একটু মধু ও লবণ মিশিয়ে সহজেই শরবত বানিয়ে
খাওয়া যায় চিয়া সিড। চাইলে ওটস পুডিং, জুস,স্মুথি ইত্যাদির
সঙ্গে মিশিয়েও খেয়ে নেওয়া যায়। এছাড়া কেউ চাইলে টক দই, সিরিয়াল,
রান্না করা সবজি বা সালাদের উপরে ছড়িয়েও খেতে পারেন। স্বাভাবিক পানি কিংবা
হালকা কুসুম গরম পানিতে ২০-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখবেন চিয়া সিড ।
এছাড়া সকালে খালি পেটে খেতে পারেন। খালি পেটে চিয়া সিড গ্রহণ করলে
কিছুটা সময় ক্ষিদা নিবৃত্ত করে যা ওজন নিয়ন্ত্রণে খানিকটা ভূমিকা রাখে । আবার
ঘুমানোর আগেও এটি খাওয়া যায়। চিয়া সিড খাওয়ার সময় প্রচুর পরিমাণে পানি
পান করা উচিত, কারণ পর্যাপ্ত পানি ছাড়া এটি খেলে হজমে সমস্যা হতে পারে।
চিয়া সিডে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসি, ড যা
শরীরের মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে এবং এর প্রভাবে দ্রুত ওজন কমতে
সহায়তা করে। চিয়া সিডের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার। ফলে
অনেকক্ষণ পর্যন্ত খিদে পায় না। স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করে এটি। সুষম
আহার, স্ট্রেস কম থাকলেই শরীর সুস্থ থাকবে। আর চিয়া সিডের মধ্যে প্রচুর
পরিমাণে প্রোটিন। যা পেটের চর্বি কমাতে সাহায্য করে। পানি বা দুধে
সারারাত চিয়া বীজ ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে খেতে পারেন।
এছাড়া সালাদ,স্যুপ, ওটস যে কোন জুসের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে পারেন এই
বীজ। চিয়া সিড রয়েছে প্রচুর আশ জাতীয় উপাদান, যা খেলে
আপনার ভরা মনে হবে। এর ফলে ক্ষুধা কম লাগবে। চিয়া সিডের সঙ্গে
পানি মেশালে আয়তনে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাই প্রতিদিন পরিমাণ
মতো চিয়া সিড খেলে ক্ষুধা কম লাগবে এবং এর উপাদান
গুলো ওজন কমাতে সাহায্য করবে।
চিয়া সিডের পুষ্টিগুণ
চিয়া সিড ( চিয়া বীজ) অত্যান্ত পুষ্টিকর একটি 'সুপার ফুড'। এতে দুধের
চেয়ে ৫ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম, পালং শাক এর চেয়ে তিনগুণ বেশি আয়রন, এবং কলার
চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম রয়েছে। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণ, হজম শক্তি বৃদ্ধি
এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত কার্যকর।
প্রতি ১০০ গ্রাম চিয়া বীজের পুষ্টিমান নিচে দেওয়া হলঃ-
পুষ্টি উপাদান
পরিমাণ
ক্যালরি
৪৮৬ kcal
প্রোটিন
১৬.৫ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট
৪২.১ গ্রাম
খাদ্য আস (ফাইবার)
৩৪.৪ গ্রাম
স্নেহ পদার্থ (ফ্যাট)
৩০.৭ গ্রাম
চিয়া সিডকে কেন সুপার ফুড বলা হয়
বীজ জাতীয় যেকোন খাবারই স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। চিয়া
সিডকে বলা হয় সুপার ফুড। কারণ, এতে
রয়েছে প্রচুর ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, কোয়েরসেটিন,কেম্পফেরল,
ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড ও ক্যাফিক এসিড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট,
পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং ধ্রবনীয় ও অধ্রবণীয়
খাদ্যআশ।
চিয়া সিড খাওয়ার সর্তকতা
মাত্রাতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো নয়, একই কথা প্রযোজ্য চিয়া সিডের ক্ষেত্রও।
তাই অধিক স্বাস্থ্য উপকারী খাবার বিবেচনায় মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ না
করে দিনে ১-২ চা চামচের বেশি গ্রহণ না করাই উত্তম।
তাছাড়া ঠিক মত চিয়া সিড ভিজিয়ে গ্রহণ না করলে গলায় আটকে
গিয়ে শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যার সূত্রপাত ঘটাতে সক্ষম। এই দিকগুলো খেয়াল
রেখে সর্তকতা অবলম্বন করে চিয়া সিড খেলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে বলে
আশা করা যায়।
চিয়া সিড নিঃসন্দেহে বেশ উপকারী খাদ্য উপাদান বলে আমি মনে
করি। এর পুষ্টিমান ও গুনাগুন সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে অবশ্যই
ঢালাওভাবে গ্রহণ না করে একজন অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন এবং চিয়া
সিড কোথা থেকে কিনছেন তা খেয়াল করে কিনুন।
কেননা, ভেজালের মিশ্রণে এই উপকারী খাবারটিও হয়ে উঠতে পারে স্বাস্থ্যর জন্য
হুমকিস্বরূপ।
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও SEO এক্সপার্ট,কনা বঙ্গ ব্লগের একজন ওয়েব ডেভেলপার/ডিজাইনার,ব্লগার,ওয়েবসাইট অওনার/এডমিন তিনি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ৩ মাসের অভিজ্ঞতায় তিনি শিক্ষার্থীদের ফ্রিল্যান্সিং জগতে সফল হওয়ার জন্য সহায়তা করে যাচ্ছেন।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url